ঘোড়ার আড়াই চাল ২

মৃদুল সে রাতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক চেষ্টা করেও এই নম্বরটা লাগাতে চেষ্টা করে যায় কিন্তু অসফল হয়।

প্রথমে মৃদুল ভাবে এটা ওই শঙ্করের নতুন কোন বদমাইশি কিন্তু তার রিপোর্টার মন যেন এই ঘটানায় অস্বাভাবিক একটা কিছু অনুভব করে ।

এই ঘটনাটা পর পর তিন দিন ধরেই ঠিক রাত বারোটা বেজে দশ মিনিটেই হয় আর মৃদুল যেন আস্তে আস্তে অনুভব করে যে তাকে অদিতি আর বীরপুর টানছে খুব বেশী করেই টানছে।

পরেরদিন অফিসে পৌঁছেই মৃদুল সোজা তার এডিটারের সঙ্গে দেখা করে তার বীরপুর যাবার ব্যাপারে কনফার্ম করে দেয়।

এডিটারের অফিস থেকে বেরোতেই তার সঙ্গে সোনালির আর শঙ্করের সঙ্গে দেখা।

মৃদুল তাদেরকেই খুজছিল কারন রাজু ,সোনালি আর শঙ্কর এই তিনজনই তার টিম আর এই টিম ছাড়া সে কোন স্টোরিই কভার করতে যায় না।

মৃদুল তার নতুন প্রজেক্টের কথা উচ্ছাসের সঙ্গে বলতে গিয়েও নীলকান্ত কর্মকার কে দেখে চুপ করে যায়,

শঙ্কর এইভাবে তার বসের হটাত চুপ করে যাওয়া দেখেই বুঝে নেয় যে নিশ্চয় কোন ব্যাপার আছে

আর চোখ ঘোরাতেই নীলকান্ত কর্মকারের বাঁদরের মত মুখটা দেখেই শঙ্কর তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই কিছু বলতে যাচ্ছিলম কিন্তু মৃদুলের চোখের ইসারাতেই সবাই নীলকান্ত কে পেছনে ফেলে রেখে ক্যান্টিনে চলে গেল।

ক্যান্টিনের ভিড়েই যেন মৃদুল হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো কারন আর একটু হলেই হয়তো নীলকান্তর সামনেই সে তড়বড় তড়বড় করে তার আগামী প্রজেক্ট পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করে ফেলত ।

আর তাহলেই হয়তো ”নিলু কাকু” একটা না একটা ব্যাগরা দেওয়ার চেষ্টা করতই।

”নিলু কাকু”
শুনে অবশ্য কেউ যেন নীলকান্ত কর্মকার কে বয়স্ক না ভেবে বসে, তার এই নামটাও শঙ্কর বাবুরই দান!

নীলকান্ত এতটাই পাকা আর এত বিজ্ঞ তার হাবভাব যে তার এই নামকরণ করেছিলো শঙ্কর আর সেই থেকে এই নামটাই চালু হয়ে গিয়েছে মৃদুলের পুরো টিমের কাছে।

নীলকান্তের খুব হিংসা মৃদুলের উপর আর সে সবসময়ই চেষ্টা করে যাতে সে মৃদুলের থেকে বেশী ফেমাস আর বড় সেলিব্রিটি হয়ে যায় আর এইজন্য সে নোংরামি করতেও একফোটা পিছপা হয়না।

নিলুর এই স্বভাবের জন্যই ওকে এই গোটা অফিসে কেউ সহ্য করতে পারে না।

তবে মৃদুলের মাথায় এখন আর নিলুর চিন্তা ছিল না , সে তার আগামী দিনের প্ল্যানটা এইবার তার টিমের কাছে বললো।

তবে মৃদুল যে রকম উচ্ছাস আসা করেছিল তা কিন্তু সে দেখতে পেলনা তার টিমমেটদের মধ্য।

একমাত্র শঙ্করই উল্লাস করে উঠে বললো

”গুরু এইবার আমরা ভুত ধরবো? সাবাস শুনেই আমি আনন্দে ছটফট করছি যে কবে যাব”

এই উচ্ছাস শঙ্করের স্বাভাবিক আচরণেই পরে তাই মৃদুল খুব একটা মাথা ঘামালো না ।

তবে সে আসা করেছিলো যে অন্তত সোনালি উচ্ছসিত হবে তার সঙ্গে এই ভাবে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে কিন্তু সোনালি একদমই চুপ করে ছিল।

এইবার রাজু মুখ খুললো , সে বলে উঠলো

” কিন্তু ছোটকুদা তুমি ওই বীরপুর গ্রামে চলে গেলে আমাদের যে কেসটা নিয়ে এখন তদন্ত করছি তার কি হবে?”

রাজুর কথা শুনে এইবার মৃদুলের সেই কেসটার কথা মনে পরে গেল।

মাস খানেক আগে তাকে একটা নতুন কেস দেওয়া হয়, একটা বাচ্চাদের হোমে তিনটে বাচ্চার মৃত্যু।

সেই মৃতদের মধ্য ছিল একটা ছেলে আর দুটো মেয়ে।

ছেলে মেয়েগুলির কারুরই বয়েস দশ পেরোয়নি ।

কিছুদিন তদন্তের পরে কিছু হদিস না পেয়েই যখন মৃদুল হতাশ হয়ে পড়েছিল আর তার রিপোর্টে এটাই উল্লেখ করতে যাচ্ছিলো যে সবাই মনে হয় অপুষ্টি আর অসুস্থতার জেরেই মৃত ,

তখনই সে একটা বেনামি ফোন পায় আর সেই ফোনের কণ্ঠস্বরের মালিক তাকে দুদিন পরে বিকেলে চায়না টাউন ( ট্যাঙরা) তে দেখা করতে বলে।

কিন্তু সেইদিনই সব পাল্টে যায় কারন বিকেলেই তার এডিটার তাকে ডেকে এই ভূতুড়ে গ্রামের কেসটা দেয় আর সেইদিন রাত থেকেই সেই রহস্যময় ফোনটাও আসা শুরু হয়।

এই দুই মিলেই মৃদুলের মাথা থেকে সেই হোমের কেসটা একদম মুছেই দিয়েছিল।

এখন রাজুর কথায় তার মনে পরে।

মৃদুল উৎসুক ভাবে বলে

”তুই কি কিছু আপডেট পেয়েছিস কেসটার ব্যাপারে?”

রাজু শান্ত স্বরে বলে

” আমি গিয়েছিলাম সেইদিন বিকেলে ট্যাঙরা কিন্তু গিয়ে দেখে একটা লোক রাস্তায় এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে আর জায়গাটা পুরো ভিরে থিকথিক করছে তাই আমি চলে আসি আর নতুন কিছু আপডেট নেই”।

মৃদুলও এইবার বলে

”শোন ওই হোমের ব্যাপারে যে ফোন করেছিল মনে হয় সেই ব্যাপারটাও ফলস, কেউ হয়তো ইয়ার্কি মেরেছিলো না হলে সে ঘুরে ফোন করলো না কেন? ছাড়তো পুরনো ব্যাপার এইবার নতুন কেসটা নিয়ে ভালো করে ভাব”

বলে মৃদুল টেবিল ছেড়ে উঠে পরে।

কিন্তু এতকিছু কথার মধ্য সোনালি যে একটাও কথা বলেনি সেটা মৃদুল তার নতুন প্রজেক্টের উত্তেজনায় খেয়ালও করেনি।

মৃদুল আর শঙ্কর বেরিয়ে যেতে রাজুও বেরিয়ে যায়, সেই ফাঁকা টেবিলে তখন শুধু সোনালি একাই বসেছিল আর নিজের মনেই যেন কি ভেবে যাচ্ছিলো।

যথারীতি সেই দিন রাত বারোটা দশেও সেই ”অদিতির” ফোন আসে আর সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেই ফোনটা কেটে যায়।

মৃদুল নিজে একটা সর্বভারতীয় নিউস চ্যানেলের রিপোর্টার ,তার পক্ষে একটা মোবাইল ফোনের নম্বর বার করা খুব একটা কঠিন কাজ নয় কিন্তু এই নম্বর ডিটেলস মৃদুল চেষ্টা করেও পায়নি ।

সব জায়গা থেকেই শুধু একটাই জবাব এসে ছিল যে এই নম্বরের কোন অস্তিত্বই নেই।

একমাত্র মৃদুলের ছোটবেলার বন্ধু মনোজ, যে এখন একটা মোবাইল কোম্পানির রিজনাল হেড সে বলেছিল

”দেখ নম্বরটা থেকে ফোন যখন হয় তবে তো সেটা ভূতুড়ে হতে পারেনা, তুই আমাকে কিছুদিন সময় দে আমি ঠিকই খুজে বার করবো এই নম্বরের মালিক কে”

এরপরে মৃদুলের মাথা থেকে সব বেরিয়ে গেছিলো শুধু একটাই জিনিষ তাকে টানছিলো বীরপুর আর অদিতি।

মৃদুল সবচেয়ে মুশকিলে পরে গেছিলো তার বড় বউদিকে রাজী করাতে,

কিন্তু ভগবানের অসীম দয়া যে বড় বউদিও খুব একটা ঝামেলা না করেই অনুমতি দিয়ে দিয়েছিল তবে অবশ্যই একটা শর্তে যে মৃদুল কে এই ট্যুর থেকে ঘুরে এসেই বিয়ে করতে হবে।

বড় বউদি জানতো না যে মৃদুলও মনে মনে এটাই চাইছিল আর সে ভেবেও রেখেছিলো যে এইবারেই সে সোনালি কে তার মনের কথা বলে দেবে।

পরেরদিন থেকে মৃদুল খুব ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলো তাই সে তার টিমমেটদের ভালো করে লক্ষ্য করেনি, করলে দেখতে পেত যে রাজু আর সোনালি যেন কোন গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল।

চুদতে পারলে এসো

লাঞ্চের টাইমে মৃদুল তার লাস্ট মিনিটের কাজ সেরে নিচ্ছিলো তখনই তার দরজা ঠেলে রাজু ঢোকে আর বলে

”ছোটকুদা একটা ব্যাপার আমি কয়েকদিন ধরেই বলবো বলবো করছিলাম কিন্তু সময় সুযোগ পাচ্ছিলাম ,তুমি কি একটু সময় দেবে? খুবই জরুরী কথা ছিল”

মৃদুল তখন এতটাই ব্যাস্ত ছিল যে সে পুরো কথা না শুনেই বলে

” পরে রে রাজু পরে আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি? পরে বলিস এখন পারলে আমাকে এই প্রোগ্রাম সেটিঙে একটু হেল্প কর”

বলে নিজের ল্যাপটপের প্রোগ্রাম নিয়ে আবার ব্যাস্ত হয়ে পরে।

About these ads

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s